মাছি


#পল্লবী_সাহা

 ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা। নিউটাউনের রাস্তা দিয়ে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রবল বেগে ছুটে চলেছে গাড়িটা। শহরের এই এরিয়াতে এখনও ঘরবাড়ি তেমন গড়ে ওঠেনি। দু পাশের ফাঁকা জমি চিরে চলে গেছে মসৃণ কালো পিচের রাস্তা। তারই উপর দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছে চালক। ‘ যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’,  অমিতাভর গমগমে কন্ঠে বেজে ওঠে এর সামনে রাখা ফোনটা। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতে যেতেই চোখে পড়লো একটি ঝাপসা মানব মূর্তি সামনের রাস্তায় দেখা দিয়ে এক ঝলকের মধ্যেই মিলিয়ে গেল আর প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে থামল গাড়িটা। হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে এল চালক। রাস্তায় শুয়ে কাতরাচ্ছে এক মধ্যবয়স্ক শীর্ণা নারীশরীর। রক্তের স্রোত ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টিতে। এক হাত তুলে হয়ত সাহায্য প্রার্থনা করে সে। এদিক ওদিক তাকায় চালক। চারদিক ফাঁকা শুনশান।  রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে সবে। এদিকে এখনো লাগেনি। আর কিছু না ভেবে তড়িঘড়ি গাড়িতে ওঠে পড়ে সে। আজ অনেক লেট হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়িতে পৌঁছাতে হবে তাকে।

অনেকক্ষণ ধরে ডেডবডিটার দিকে তাকিয়েছিল নিশীথ। ভোর পাঁচটা বারো। এখনো সব মর্নিং ওয়াকাররা বেরোয়নি। ফিটনেস ফ্রিক নিশীথ। শুতে যতই রাত হোক সকালের জগিং একদিন মিস হয় না তার। জগিং করতে বেরিয়ে একটু এগোতেই চোখে পড়েছে দৃশ্যটা। সম্ভবত রানওভার হয়েছে কাল রাতেই। খানিকটা রক্ত জমাট বেঁধে আছে এখনো রাস্তায়। মাছি ভনভন করছে সারা গায়ে। কয়েকটা উড়ে এসে বসল নিশীথের গায়ে মুখে। তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে তাড়িয়ে একটু পিছিয়ে আসে নিশীথ। একটি দুটি করে আরও লোক এসে জমায়েত হয়েছে এরমধ্যে। ‘আহাহা, ইসস্’ ইত্যাদি সমবেদনা মূলক বক্তব্য ভেসে আসে কানে। ‘কার বাড়ির লোক কে জানে, রান ওভার হয়েছে মনে হচ্ছে, পুলিশে তো একটা খবর দিতে হবে,  সে তো হবেই’, ইত্যাদি টুকরোটাকরা কথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে সরে আসে নিশীথ। এখানে বেশীক্ষণ সময় নষ্ট করা যাবে না আর। জগিং সেরে বাজারে যেতে হবে। একমাত্র ছেলে আর্যর আজ জন্মদিন। কাল রাত বারোটার জায়গায় ১২:৪২ এ পৌঁছে উইশ করেছে নিশীথ। তাতে রাগ হয়েছে বাবুর। অফিসে প্রজেক্টের কাজ চলছে নিশীথের। ফিরতে রোজই লেট। পাঁচ বছরের আর্যর সেটা বোঝার কথা না। তার বাপি উইশ করতে লেট করেছে এটাই যথেষ্ট। গোঁজ হয়ে থেকেই ঘুমোতে গেছে কাল। সকালে তাই ভালো করে বাজার করতে হবে। দুপুরে আর্যর ফেভারিট ডিশ রান্না করবে তিয়াসা।

বাড়ি ফিরে তিয়াসাকে ঘটনাটা বলে নিশীথ। শুনে তিয়াসার ও মুখ থেকে সমবেদনা বেরিয়ে আসে। আজকাল মানুষ কতো কেয়ারলেস আর ইরেস্পনসিবল হয়ে গেছে তাই নিয়ে আলোচনা করে দুজনে। জানে না কেন নিশীথ লাশটার কথা মন থেকে সরাতেই পারছে না। অভিমানী আর্যর সঙ্গে খুনসুটি করতে গিয়েও বারেবারেই লাশটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

রাতে বাইরে ডিনার করতে বেরোল নিশীথ তিয়াসা আর আর্যকে নিয়ে। ঝাঁ-চকচকে রেস্টুরেন্টের আলো ঝলমল পরিবেশ, আর্য বেশ খুশি। খেতে আসার আগে শপিং হয়েছে একপ্রস্থ। যা যা পছন্দ আর্যর সবই প্রায় কিনে দিয়েছে নিশীথ। রাগ এখন গলে জল। নিশীথও ছেলের খুশি মুখ দেখে খুশি। ওয়েটার এসে খাবার দিয়ে গেল, সবারই খিদে পেয়ে গেছে। তবে নিশীথ বেশি কিছু খাবে না। কেন কে জানে সকাল থেকেই শরীরটা বিশেষ ভালো নেই তার। দুপুরেও প্রায় তেমন কিছুই খেতে পারেনি। তারজন শুধু স্যুপ। তিয়াসার সঙ্গে কথা বলতে বলতে গরম ধোঁয়া ওঠা স্যুপে চামচ ডোবাতেই ভুরু কুঁচকে গেল নিশীথের। স্যুপের মধ্যে একটা মাছি ভাসছে। ক্ষিদের মুখে এরকম দৃশ্য দেখেই তিতিবিরক্ত হয়ে উঠল নিশীথ। “ওয়াটার, ওয়েটার”,  ইয়েস স্যার”, “এই সার্ভিস আপনাদের মিনিমাম হাইজিন টুকুও মেন্টেন করতে জানেন না? খাবারে মাছি ভাসছে। এ রকম খাবার খেতে পারে মানুষ?” অবাক চোখে ওয়েটার ছেলেটি একবার স্যুপের বাটির দিকে আরেকবার নিশীথের দিকে তাকায়। “ কোথায় মাছি স্যার?” স্যুপের বাটির দিকে আরেকবার তাকায় নিশীথ। ভেসে থাকা মাছিটাকে দেখে দ্বিগুন জোরে বলে, “ ফাজলামি হচ্ছে? এক্ষুনি চেঞ্জ কর এটাকে। মিনিমাম সিনসিয়ারিটি যদি থাকে আজ কোথাও!” ওয়েটার কথা না বাড়িয়ে স্যুপের বাটি টা উঠিয়ে নিয়ে যায়। রেপুটেশনের প্রশ্ন বলে কথা। তিয়াসা চুপচাপ পুরো ব্যাপারটাই দেখছিল। ওয়েটার চলে যেতে বলল, “ you are overreacting নিশীথ। কি হয়েছে তোমার? স্যুপে তো মাছি ছিলই না।“ “ ছিল, তুমি দেখনি। আর্য খাওয়া শুরু না করলে আমি এক্ষুনি উঠে যেতাম।“ তিয়াসা আর কিছু না বলে চুপ করে যায়। বিরক্ত মনে বাড়ি ফেরে নিশীথ। দিনটাই মাটি।

পরদিন সকালে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজটা খোলে নিশীথ। কালকের রান ওভার হওয়া লাশটার ব্যাপারে বেরিয়েছে ছোট করে। চোখেই পড়বে না অনেকের। কাগজ টা একটু এদিক-ওদিক নেড়ে উঠে পড়ে নিশীথ। প্রজেক্টের চিন্তা মাথায় ঘুরছে। অফিসে দৌড়োতে হবে। তড়িঘড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে যেতেই শিউরে উঠে পিছিয়ে আসে নিশীথ। গাড়ির স্টিয়ারিং আর সিটের ওপর অনেকগুলো মাছি ভনভন করছে। এ আবার কি বিদঘুটে ব্যাপার! গাড়িতে তো কোন খাবার দাবার ছিল না। কিন্তু ভাববার টাইম নেই এখন। তড়িঘড়ি মোবাইল বের করে ক্যাব বুক করাতে মন দেয় সে। অফিসে গিয়েও মন থেকে তাড়াতে পারে না ঘটনাটা। তিয়াসা ফোন করেছিল,  গাড়ি না নিয়ে ক্যাবে যেতে দেখে। এড়িয়ে গেছে। রাতে বাড়ি গিয়ে বলবে।

রাতে ডিনার টেবিলে নিজেই কথাটা তোলে তিয়াসা। গতকাল থেকে নিশীথের অন্যমনস্কতা চোখ এড়ায়নি ওর। তবে গাড়িতে মাছি শুনে চোখ কপালে উঠে তিয়াসার। নিশীথ অবাক হয়ে শোনে, “কোথায় মাছি?  কি বলছ? আমি তো শপিংয়ে গেলাম গাড়ি নিয়েই, ফেরার সময় আর্যকে স্কুল থেকে নিয়ে আসলাম। কোন মাছিই তো ছিলনা গাড়িতে।“ “তবে কি আমি মিথ্যে বলছি?” খিটখিটে মেজাজে উত্তর দেয় নিশীথ। “ সেটা না নিশীথ, কিন্তু মাছি যদি থাকে বন্ধ গাড়িতে সেগুলো যাবে কোথায় বল?” চুপ করে থাকে নিশীথ। এ কথার উত্তর সেও জানে না। কাছে এগিয়ে আসে তিয়াসা, নিশীথের কাঁধে হাত রেখে আলতোভাবে বলে, “ তুমি হয়তো প্রোজেক্টের কাজে খুব বেশি ষ্ট্রেসড।“ অসহায় চোখে তাকায় নিশীথ। তিয়াসা বুঝছে কি তাকে? কে জানে?

রাতে ঘরের আলো নিভিয়ে টিভি দেখা নিশীথের চিরকালীন অভ্যেস। পুরনো দিনের সিনেমার সিডির ভালো কালেকশন আছে ওর। তিয়াসা ঠিকই বলেছে, এটা কাজের চাপ জাস্ট। মন ঘোরাতে আজ তাই ‘মধুমতী’ চালিয়ে বসেছিল নিশীথ। দেখতে দেখতে বিভোর হয়ে গেছিল অনেকক্ষন। উন্নত কি পোকা যেন ডিস্টার্ব করছে সেই কখন থেকে। আন্দাজে চাপড় মারে নিশীথ। ঘরের সব লাইট অফ করে বসা ঠিক হয়নি। “ধুত্তোর”, শেষমেষ বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে লাইট চালাতে পিঠ দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেল একটা। নিশীথের বসা সোফাটার চারদিকে থিকথিক করছে মাছি। পিছোতে পিছোতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় নিশীথের। মাছি গুলো একটা দুটো করে উড়ে আসছে, ছেঁকে ধরছে’ নিশীথকে। ঠিক যেমন ঐ লাশটার গায়ে ছেঁকে ধরেছিল। নিশীথের নাকে মুখে চোখে শুধু মাছি আর মাছি। উফ্ কি দুর্গন্ধ! দম আটকে আসে নিশীথের। চোখ বন্ধ হয়ে আসার আগে এক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিন বৃষ্টির রাতের রান ওভার হয়ে যাওয়া মানুষটার হাত বাড়িয়ে শেষবারের মতো বাঁচতে চাওয়ার আকুতি।

পরদিন বিকেলে কলকাতার সব নিউজ চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ, ‘ নিউটাউনের অ্যাকসিডেন্টের দায় স্বীকার করে থানায় আত্মসমর্পন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিশীথ গাঙ্গুলীর।

©Pallabi Saha

Comments