জয়_পরাজয়
#জয়_পরাজয়
#পল্লবী_সাহা
বেশ খানিকক্ষণ ধরেই ‘বৌদি ও বৌদি’ ডাকটা কানে ভেসে আসছিল মনীষার, আমল দেয়নি। ভিড়ের মধ্যে কার ননদ কাকে বৌদি বলে ডাকছে তাতে মনীষার মাথাব্যথা নেই। সে আপাতত একটা বিডসের নেকলেস নিয়ে দরদামে ব্যস্ত। অফিস থেকে ফেরার পথে মাঝেমধ্যেই হাতিবাগানে নেমে টুকটাক জিনিস কেনা মনীষার অনেক দিনের অভ্যেস। এই ধরনের নেকলেস অনলাইনে মাঝে মধ্যেই দেখেছে, কিন্তু অনেকের মতই অনলাইনে বিক্রি হওয়া জিনিসের ওপর খুব একটা ভরসা পায়না। সাড়ে পাঁচশর এক পয়সা কমে ছাড়বেনা দোকানদার। তাই নিয়েই তর্ক চালাচ্ছিল নিষ্ঠাভরে। হঠাৎ হাত ধরে টান, ‘ও বউদি’, হকচকিয়ে সামনে তাকাল মনীষা। ঘোর কাটতে একটু টাইম লাগল। রংচঙে বিডসের নেকলেসের জায়গায় চোখের সামনে জায়গা করে নিয়েছে শ্যামলা রঙের মাঝারি গয়নার একটি মাঝবয়সী মহিলা। একমুখ হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে মনীষার দিকে, ‘ শিবানী’, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো মনীষার। ‘ যাক বাবা চিনতে পেরেছ তালে, সেই কখন থেকে ডাকছি বৌদি বৌদি করে’, হাসি আর ধরছেনা শিবানীর মুখে। দোকানদারের হাতে পাঁচশ টাকা ধরিয়ে প্যাকেটটা নিয়ে ভিড়ের বাইরে বেরিয়ে আসে মনীষা। ‘ তুমি এখানে কি করতে?’, ‘একটু শপিং করতে এসেছিলুম গো, বউকে নিয়ে’। ‘বৌ’! অবাক গলা মনীষার। আবার একগাল হাসি শিবানীর, ‘ আমার বড় ছেলে সমীরের বউ গো, এই যে’। পেছনের আঠার উনিশ বছরের মেয়েটিকে দেখায় শিবানী। রোগা ফর্সা মেয়েটা মুখে পাকাটে ভাব, মনীষার দিকে তাকিয়ে হাসল মেয়েটা। ‘ও আচ্ছা’, মনে মনে ভাবল, কাজের মেয়েদের ক্লাস, এদের আবার কি হবে। তবে মনের কথা মনেই থাক, আপাতত মনীষা মাঝখানের পদমর্যাদা বজায় রাখে। ‘খুব ভালো লাগলো তোমাকে দেখে, আচ্ছা আসি তাহলে, ‘যাবে কি গো’, হাত চেপে ধরেছে শিবানী, ‘ছেলের বিয়েতে খাওয়াতে পারিনি তোমায়, এখন ছাড়বো ভেবেছ?’ কোন জোরাজুরি, ওজর-আপত্তি ধোপে টিঁকলো না। রাস্তায় সিন ক্রিয়েট করারও ইচ্ছে ছিল না মনীষার। অগত্যা একটা সস্তা তেলচিটে রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই হল তাকে। শিবানীর পুত্রবধূ মানে ললিতা জানালো সে চাউমিন আর চিলি চিকেন খাবে। শুনে শিউরে উঠে মনীষা বলল, তার ফুড পয়জনিং হয়েছিল কদিন আগে, এখনও ওষুধ চলছে। তো সে কোল্ড ড্রিঙ্ক ছাড়া আর কিছুই নেবে না। শুনে অবশ্য মনমরা হয়ে গেল শিবানী। একটু খারাপও লাগলো মনীষার। কিন্তু এই রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া ওর অসাধ্য। ‘ তো, কেমন আছো বলো। বৌমা সেবা করছে খুব?’ মেয়েটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল মনীষা। একগাল হেসে ববিতার দিকে তাকায় শিবানী। কথায় কথায় হাসার রোগ ওর এখনো গেল না, ভাবে মনীষা। চেহারাটা একই রকম আছে শিবানীর। চুল একটু পাতলা হয়েছে আর একটু রোগা। কিন্তু আর কোন পরিবর্তন হয়নি এই আট বছরে। ‘তোমার বড় ছেলে কি করছে এখন’? ‘সমীর পোদ্দারবাবুর দোকানে কর্মচারী গো’। পোদ্দার বাবু নামটা শুনে হাতড়াতে থাকে মনীষা। ‘ঐ যে গো, তোমাদের গলির মুখের বড় মুদির দোকান টা’, বলে ফেলেই অপ্রস্তুতে পড়ে যায় শিবানী। ওই বাড়ির সঙ্গে আট বছর আগেই সম্পর্ক চুকে গেছে মনীষার, সেটা শিবানীর অজ্ঞাত নয়। মনীষা ওর অপ্রস্তুত ভাবটা বুঝেও না বোঝার ভান করে বলে, ‘আর ছোট ছেলে?’ ‘সে কমার্স পড়ছে গো কলেজে’। ‘ বাহ্ তাই নাকি’, মন থেকে খুশি হয় মনীষা। শিবানীর ছোট ছেলে পড়াশোনায় বরাবরই ভালো, বলা যায় দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ ছিল। শিবানীর মুখে অনাবিল হাসি, ‘ছেলের বাপ বলে ছেলেকে আরও পড়বে, মাস্টার বানাবে’। ‘বাপ!’ মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় শব্দ টা মনীষার। একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায় শিবানী, তারপর একটু ভেবে বলে, ‘ সবই তো জানতে বৌদি, তোমাকে তো সবই বলতাম। অনেক কষ্ট করেছি গো। সেই যে তুমি চলে গেলে তারপর কত কিছু হয়ে গেল, কি কি বলব?
তা অনেক কিছুই বলল শিবানী। ওলা তে ফিরতে অন্যমনস্ক ভাবে ওর কথাই ভাবছিল মনীষা। এসি চালাতে দেয়নি, বৃষ্টি ভেজা হাওয়া মুখে ঝাপটা মারছে। শিবানীর কথাগুলোই ঘুরছে মনের মধ্যে। বিয়ের পর দুই বছর দেখেছে শিবানী কে। মানে যতদিন মিসেস মনীষা মিত্র ছিল ততদিন। কখনো গলা টিপে দেওয়ায় বসে যাওয়া ওর বরের হাতের নখের দাগ, কখনো মুখ থেঁতলে দেওয়া চেহারা, অনেক রূপই মনে আছে শিবানীর। দুটো ছেলেকে মানুষ করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম আর অকর্মণ্য সন্দেহবাতিক স্বামীর মাত্রাতিরিক্ত প্রেমের চিহ্ন বয়ে বেড়ানো এই ছিল শিবানীর রোজনামচা। শিবানীর বিয়ের পর নাকি রাগের মাথায় ভরা প্রেসার কুকার তুলে মাথায় বসিয়ে দিয়েছিল শিবানীর স্বামী। শুনে আঁতকে উঠত মনীষা। হেসে হেসেই কথাগুলো বলতো শিবানী, ‘ কি জানি বৌদি মাঝে মাঝে ভয় করে, খালি বলে কেটে ফেলবে, ঘুমের মধ্যে যদি কোনদিনও গলা টিপে মেরে ফেলে’, বলেই হাসতো শিবানী। রেগে যেত মনীষা, হাসি দেখলে গা জ্বলে যেতো। আর মনে মনে ভাবতো শিবানী স্বামীকে ছেড়ে দেয় না কেন। স্বামী এত নরাধম হয়! আর তার পীযুষ! পীযুষের কথা ভাবতেই মনটা ভালবাসায় ভরে যেত মনীষার। হ্যাঁ তখন যেত, নববিবাহিতা মনীষা, স্বামীপ্রেমে মগ্ন মনীষা। জীবন তখন রঙিন, হালকা। দুজনের ছোট সংসার, সারাদিন টুকিটাকি কাজ সেরে বিকেলে পীযুষের জন্য সুন্দর করে সাজতো মনীষা। কখনো পীযুষ ফোন করতো, অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয়েই মনীষাকে নিয়ে বেড়োতো, ঘুরেটুরে রাতে ডিনার করে ফেরা। বিয়ের পর প্রথম প্রথম ছেড়ে আসা চাকরির জন্য মন কেমন করত মনীষার। কিন্তু পীযুষের একদম নামগন্ধ যে বউ গরমে ঘামে ভিজে অফিস যাবে। বউ থাকবে পুতুলের মত, একমাথা চুলে সুন্দর গন্ধ, পরিপাটি বেশবাস, নিখুঁত মেকআপ করা মুখ, হাতে লম্বা লম্বা নখে নিখুঁত রঙের ছোপ – এই না হলে বউ! কেন পীযুষ কি কম কামায়? না, কোন অভিযোগ ছিল না পীযুষকে নিয়ে মনীষার। পীযুষের মত বর পাওয়া যে ভাগ্যের ব্যাপার সেটা এক বাক্যে মনীষা থেকে শুরু করে মনীষার বাবা-মা ও স্বীকার করত। বান্ধবীরা করত ঈর্ষা, মনীষা করত অহংকার। সেই অহংকার ছিল অটুট তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকী পর্যন্ত। আর সেই বিবাহ বার্ষিকীর পার্টি মনীষার সারাজীবন মনে থাকবে। ‘ ম্যাডাম ও ম্যাডাম’ ওলা ড্রাইভারের এর ডাকে হুঁশ ফেরে মনীষার। আট বছর আগের থেকে নিজেকে টেনে এনে ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়ে ওলা থেকে।
২০০৬ এর ২৬ শে ডিসেম্বর, পালিত বাড়ীতে সাজো সাজো রব। একমাত্র মেয়ে মনীষার বিয়ে। মেয়ে যাকে বলে সর্বগুণসম্পন্না, সুন্দরী বুদ্ধিমতী শিক্ষিতা চাকুরিরতা। পাত্রও লাখে একজন, বিশাল ইঞ্জিনিয়ার, নামকরা প্রাইভেট কোম্পানিতে উঁচু পোস্টে কর্মরত। মনীষা পীযুষের প্রেমে তখন থেকেই মগ্ন। খুব সুন্দর কথা বলত পীযুষ। সবদিক থেকে ছিল মনীষার মনের মত, যাকে বলে ড্রিমম্যান। এরকম যোগাযোগ কজনের ভাগ্যে ঘটে? মনীষা ভাগ্যবতী বলেই না পীযুষের মতো মানুষকে স্বামী হিসেবে পাচ্ছে। চোখের সামনে দিনটা দেখতে পায় মনীষা। আহ্লাদে ছলছল আট বছর আগের সে নিজে, আনন্দে ডগমগ তার বাবা-মা। ২০০৬ এর ২৬শে ডিসেম্বর আর ২০০৯ এর ২৬শে ডিসেম্বর, এর মাঝের সময়টা ছিল রূপকথা। সেদিনই বা কি এমন বেশি বাড়াবাড়ি করেছিল পীযুষ? ভাবে মনীষা। একটু বেশীই মদ খেয়ে ফেলেছিল। চোখ লাল, দাঁড়াতেও পারছিলো না ঠিক করে, জড়িয়ে যাচ্ছিল কথা।,, নিজের পার্টিতে নিজেকেই সামলাতে পারছিল না পীযুষ। আর মনীষা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল নিজেকে সংযত রেখে অতিথি আপ্যায়ন চালিয়ে যাওয়ার। দুজনেরই বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবে ভর্তি ছিল চারদিক। কোন রকমে বাড়িতে ফিরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল সে। লজ্জায় আর অপমানে জর্জরিত হতে হতে ভেবেছিল পরদিন একহাত নেবে পীযুষকে। এমন বকা দেবে, আর হাত বাড়াবে না কোন দিনও মদের বোতলের দিকে। স্বামী-আহ্লাদে আহ্লাদী মনীষা, ভেবেছিল এই শুরু আর এই শেষ। বকা দেবে পীযুষকে, দরকার হলে ঠোঁটও ফোরামে, তাহলেই পীযুষ ধরাশায়ী, আর তাকাবেও না ওদিকে। কিন্তু পরদিন পীযুষকে একথা বলতে গিয়ে হোঁচট খেলো মনীষাই। “কাম অন মনীষা, পার্টিতে এসব হয়েই থাকে, এমন কিছু বড় ব্যাপার না, গ্রো আপ।“ পুরো ব্যাপারটাই হেসে উড়িয়ে দিয়ে উঠে যায় পীযুষ, অফিসের জন্য রেডি হতে। হতভম্ব হয়ে যায় মনীষা। তারপর আস্তে আস্তে নিজেকেই বুঝিয়ে নেয়, “হ্যাঁ পার্টিতে তো লোকে মদ খায়ই, হয়তো বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিল পীযুষ। তেমন আর কি ব্যাপার? আর হবে না”। নিজেকে বুঝিয়ে নেয় এরকম তো হয়ই। কিন্তু এরকম আর কি কি হয়? আর কত কিছু নিয়ে বোঝাবে মনীষা নিজেকে, এরকম তো হয়ই। যেদিন পীযুষ মদ খেয়ে এসে গায়ে হাত তুললো, সেদিন মনীষা কি করে নিজেকে বোঝাবে এরকম তো হয়ই? অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল মনীষা পীযুষের অফিস থেকে ফেরার, ফোনও করেছে, সুইচ অফ। চিন্তা হচ্ছিল, বারবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল উদ্বিগ্নমুখে। শেষে সাড়ে দশটার পর পীযুষের গাড়িটা ঢুকতে দেখে ছুটে গিয়ে দরজায় দাঁড়ায়। পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল পীযুষের হয়তো শরীর খারাপ। কিন্তু টালমাটাল পায়ে পীযুষকে দরজার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে সারা শরীরে যেন কারেন্টের শক লাগে মনীষার। দরজা থেকে সরে দাঁড়াতেও ভুলে যায়। মনীষাকে দরজায় পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ভুরু কুঁচকোয় পীযূষ। “তুমি-তুমি আবার…”, এর থেকে বেশি কথা বেরোয় না মনীষার মুখ থেকে। “আ-হহ্”, প্রচন্ড বিরক্তিতে এক প্রবল ধাক্কায় মনীষাকে সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢোকে পীযুষ। হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে বাঁচে মনীষা। “ তুমি-তুমি আমার গায়ে হাত তুললে? ভেবেছটাকি তুমি? ছোটলোক দের মত বাইরে থেকে গিলে এসে বাড়িতে বউ কে পেটাবে? ভেবো না এসব আমি সহ্য করবো বুঝলে?” সোফায় এলিয়ে থাকা পীযুষের সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচাতে থাকে মনীষা। হঠাৎই ছিটকে উঠে পীযুষ। মনীষা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক চড় মারে তার গালে, তারপর বিড়বিড় করে কিছু বলে আবার ঢুলে পড়ে সোফাতেই। চোখে অন্ধকার দেখে মনীষা, পীযুষ মারল থাকে, পীযুষ মারলো! এক মুহূর্তের জন্য শিবানীর কালশিটে পড়া মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছুটে গিয়ে বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দেয় মনীষা। অনেক রাত অব্দি কাঁদতে কাঁদতে কখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই। সকালে যখন নিজের জামাকাপড় ভর্তি ট্রলি নিয়ে ঘর থেকে বেরোলো তখনো পীযুষ সোফায় ঘুমোচ্ছে।
বাড়িতে বাবা মা বুঝিয়েছিল অনেক। পীযুষ ও ফোন করেছিল। ও নাকি কথা বলতে চায়। ধরেনি মনীষা। পীযুষকে আর সুযোগ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। আজকালকার দিনের শিক্ষিতা প্রগতিশীল মেয়ে মনীষা। পড়ে পড়ে মার খাবার হলে ওর আর শিবানীর মধ্যে পার্থক্য কোথায় রইল। পুলিশ কেস করতে চেয়েছিল, বাবা মার অনেক অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ওটা আর করে উঠতে পারেনি। কিন্তু ফিরেও আর যায়নি। চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে একটা। ডিভোর্সও নিয়ে ছেড়েছেন পীযুষের থেকে। খোরপোষ চায়না ও। নিজের খরচা নিজে চালাতে সক্ষম মনীষা।
বাড়ি ফিরে গা ধুয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মনীষা। চোখের সামনে আবার শিবানীর হাসিমুখটা ভেসে ওঠে। “ অনেক মার খেয়েছি গো বউদি, জানোই তো সব। কতবার বাপের বাড়ি গিয়ে বসেছি, প্রতিজ্ঞা করেছি আর ফিরবো না, আলাদা থাকবো। ছেলেদেরও আমিই মানুষ করব। গতর খেটে খাই আমি, ভয় কিসের! আরো খাটবো, আরো পয়সা পাব। ও খেতে দেয় নাকি আমায়?” হাসি পাচ্ছিল মনীষার। আট বছর পরেও একই ধরনের কথা বলে শিবানী। যদিও তখন আর এখনকার পরিস্থিতিতে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তখনও এই কথাগুলো বলতো শিবানী। বরের সাথে ঝগড়া করে, অপমান-কটুকথা-দুর্ব্যবহার সহ্য করে এসে কাঁদতো মনীষার কাছে। কখনো বা রাগ দেখাত বরের ওপর। বাসন মাজতে মাজতে গজগজ করে যেত এই কথাগুলোই। মায়া হতো মনীষার, আর গর্ব হতো নিজের স্বামী ভাগ্যে। সবাই বলে পুরুষ মানুষ মাত্রেই এক, কিন্তু তার পীযুষ যাকে বলে বিশাল এক্সেপসনাল। মনীষার কত খেয়াল রাখে, কত যত্ন করে। শিবানী যতক্ষণ থাকতো ততক্ষণ এসবই ভাবতো মনীষা, শিবানী চলে যাওয়ার পর ও। আজ শিবানীর ভরা সংসার, খুশিমুখ দেখে মনীষাও খুশি। শিবানীর অত্যাচার সহ্য করা পতিভক্তির নিদর্শন যে ছিলো না সেটা মনীষার থেকে বেশি ভাল আর কে জানে। মনীষা দেখেছে শিবানীকে ছটফট করতে খাঁচায় বন্দি পাখির মত। বারবার মুক্তি চেয়েছে শিবানী কিন্তু সামাজিক আর আর্থিক প্রতিবন্ধকতা তার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে। মনীষার মুক্তি পাওয়া যত সোজা শিবানীর ততটাই কঠিন। তাও আজ শিবানীর সংসার সুখ দেখে তার আর পীযুষের সুখী সংসারের কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে বারবার। মনীষা চলে আসবার পরে বার বার কথা বলতে চেয়েছে পীযুষ, বাবা-মাও অনেক অনুরোধ করেছিল একবার অন্তত পীযুষের কথা শোনার জন্য। আজ আট বছর পর মনীষা স্বাবলম্বী, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা মানুষ। কিন্তু স্বামী-সন্তান-সংসারের থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকা এক একাকী মানুষ। পীযুষের সাথে কথা বললেই হয়তো ফিরে যেত না সে, কিন্তু আজ আট বছর পরেও অজানাই থেকে গেছে তার অত ভালোবাসার পীযুষ সেদিন কিভাবে তার সাথে এত জঘন্য ব্যবহার করতে পেরেছিল। হয়তো সে কোন সমস্যায় ভুগছিল, হয়তো কোন বদ সঙ্গে পড়েছিল, হয়তো মনীষার সঙ্গ তার প্রয়োজন ছিল… কী ছিল সেটা মনীষা কোনদিনও জানতে পারবে না। শিবানির সাথে মনীষাও তার জীবনে জিতেছে, কিন্তু কোথায় যেন লুকিয়ে আছে একটু দীর্ঘশ্বাস।
©Pallabi Saha
#পল্লবী_সাহা
বেশ খানিকক্ষণ ধরেই ‘বৌদি ও বৌদি’ ডাকটা কানে ভেসে আসছিল মনীষার, আমল দেয়নি। ভিড়ের মধ্যে কার ননদ কাকে বৌদি বলে ডাকছে তাতে মনীষার মাথাব্যথা নেই। সে আপাতত একটা বিডসের নেকলেস নিয়ে দরদামে ব্যস্ত। অফিস থেকে ফেরার পথে মাঝেমধ্যেই হাতিবাগানে নেমে টুকটাক জিনিস কেনা মনীষার অনেক দিনের অভ্যেস। এই ধরনের নেকলেস অনলাইনে মাঝে মধ্যেই দেখেছে, কিন্তু অনেকের মতই অনলাইনে বিক্রি হওয়া জিনিসের ওপর খুব একটা ভরসা পায়না। সাড়ে পাঁচশর এক পয়সা কমে ছাড়বেনা দোকানদার। তাই নিয়েই তর্ক চালাচ্ছিল নিষ্ঠাভরে। হঠাৎ হাত ধরে টান, ‘ও বউদি’, হকচকিয়ে সামনে তাকাল মনীষা। ঘোর কাটতে একটু টাইম লাগল। রংচঙে বিডসের নেকলেসের জায়গায় চোখের সামনে জায়গা করে নিয়েছে শ্যামলা রঙের মাঝারি গয়নার একটি মাঝবয়সী মহিলা। একমুখ হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে মনীষার দিকে, ‘ শিবানী’, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো মনীষার। ‘ যাক বাবা চিনতে পেরেছ তালে, সেই কখন থেকে ডাকছি বৌদি বৌদি করে’, হাসি আর ধরছেনা শিবানীর মুখে। দোকানদারের হাতে পাঁচশ টাকা ধরিয়ে প্যাকেটটা নিয়ে ভিড়ের বাইরে বেরিয়ে আসে মনীষা। ‘ তুমি এখানে কি করতে?’, ‘একটু শপিং করতে এসেছিলুম গো, বউকে নিয়ে’। ‘বৌ’! অবাক গলা মনীষার। আবার একগাল হাসি শিবানীর, ‘ আমার বড় ছেলে সমীরের বউ গো, এই যে’। পেছনের আঠার উনিশ বছরের মেয়েটিকে দেখায় শিবানী। রোগা ফর্সা মেয়েটা মুখে পাকাটে ভাব, মনীষার দিকে তাকিয়ে হাসল মেয়েটা। ‘ও আচ্ছা’, মনে মনে ভাবল, কাজের মেয়েদের ক্লাস, এদের আবার কি হবে। তবে মনের কথা মনেই থাক, আপাতত মনীষা মাঝখানের পদমর্যাদা বজায় রাখে। ‘খুব ভালো লাগলো তোমাকে দেখে, আচ্ছা আসি তাহলে, ‘যাবে কি গো’, হাত চেপে ধরেছে শিবানী, ‘ছেলের বিয়েতে খাওয়াতে পারিনি তোমায়, এখন ছাড়বো ভেবেছ?’ কোন জোরাজুরি, ওজর-আপত্তি ধোপে টিঁকলো না। রাস্তায় সিন ক্রিয়েট করারও ইচ্ছে ছিল না মনীষার। অগত্যা একটা সস্তা তেলচিটে রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই হল তাকে। শিবানীর পুত্রবধূ মানে ললিতা জানালো সে চাউমিন আর চিলি চিকেন খাবে। শুনে শিউরে উঠে মনীষা বলল, তার ফুড পয়জনিং হয়েছিল কদিন আগে, এখনও ওষুধ চলছে। তো সে কোল্ড ড্রিঙ্ক ছাড়া আর কিছুই নেবে না। শুনে অবশ্য মনমরা হয়ে গেল শিবানী। একটু খারাপও লাগলো মনীষার। কিন্তু এই রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া ওর অসাধ্য। ‘ তো, কেমন আছো বলো। বৌমা সেবা করছে খুব?’ মেয়েটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল মনীষা। একগাল হেসে ববিতার দিকে তাকায় শিবানী। কথায় কথায় হাসার রোগ ওর এখনো গেল না, ভাবে মনীষা। চেহারাটা একই রকম আছে শিবানীর। চুল একটু পাতলা হয়েছে আর একটু রোগা। কিন্তু আর কোন পরিবর্তন হয়নি এই আট বছরে। ‘তোমার বড় ছেলে কি করছে এখন’? ‘সমীর পোদ্দারবাবুর দোকানে কর্মচারী গো’। পোদ্দার বাবু নামটা শুনে হাতড়াতে থাকে মনীষা। ‘ঐ যে গো, তোমাদের গলির মুখের বড় মুদির দোকান টা’, বলে ফেলেই অপ্রস্তুতে পড়ে যায় শিবানী। ওই বাড়ির সঙ্গে আট বছর আগেই সম্পর্ক চুকে গেছে মনীষার, সেটা শিবানীর অজ্ঞাত নয়। মনীষা ওর অপ্রস্তুত ভাবটা বুঝেও না বোঝার ভান করে বলে, ‘আর ছোট ছেলে?’ ‘সে কমার্স পড়ছে গো কলেজে’। ‘ বাহ্ তাই নাকি’, মন থেকে খুশি হয় মনীষা। শিবানীর ছোট ছেলে পড়াশোনায় বরাবরই ভালো, বলা যায় দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ ছিল। শিবানীর মুখে অনাবিল হাসি, ‘ছেলের বাপ বলে ছেলেকে আরও পড়বে, মাস্টার বানাবে’। ‘বাপ!’ মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় শব্দ টা মনীষার। একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায় শিবানী, তারপর একটু ভেবে বলে, ‘ সবই তো জানতে বৌদি, তোমাকে তো সবই বলতাম। অনেক কষ্ট করেছি গো। সেই যে তুমি চলে গেলে তারপর কত কিছু হয়ে গেল, কি কি বলব?
তা অনেক কিছুই বলল শিবানী। ওলা তে ফিরতে অন্যমনস্ক ভাবে ওর কথাই ভাবছিল মনীষা। এসি চালাতে দেয়নি, বৃষ্টি ভেজা হাওয়া মুখে ঝাপটা মারছে। শিবানীর কথাগুলোই ঘুরছে মনের মধ্যে। বিয়ের পর দুই বছর দেখেছে শিবানী কে। মানে যতদিন মিসেস মনীষা মিত্র ছিল ততদিন। কখনো গলা টিপে দেওয়ায় বসে যাওয়া ওর বরের হাতের নখের দাগ, কখনো মুখ থেঁতলে দেওয়া চেহারা, অনেক রূপই মনে আছে শিবানীর। দুটো ছেলেকে মানুষ করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম আর অকর্মণ্য সন্দেহবাতিক স্বামীর মাত্রাতিরিক্ত প্রেমের চিহ্ন বয়ে বেড়ানো এই ছিল শিবানীর রোজনামচা। শিবানীর বিয়ের পর নাকি রাগের মাথায় ভরা প্রেসার কুকার তুলে মাথায় বসিয়ে দিয়েছিল শিবানীর স্বামী। শুনে আঁতকে উঠত মনীষা। হেসে হেসেই কথাগুলো বলতো শিবানী, ‘ কি জানি বৌদি মাঝে মাঝে ভয় করে, খালি বলে কেটে ফেলবে, ঘুমের মধ্যে যদি কোনদিনও গলা টিপে মেরে ফেলে’, বলেই হাসতো শিবানী। রেগে যেত মনীষা, হাসি দেখলে গা জ্বলে যেতো। আর মনে মনে ভাবতো শিবানী স্বামীকে ছেড়ে দেয় না কেন। স্বামী এত নরাধম হয়! আর তার পীযুষ! পীযুষের কথা ভাবতেই মনটা ভালবাসায় ভরে যেত মনীষার। হ্যাঁ তখন যেত, নববিবাহিতা মনীষা, স্বামীপ্রেমে মগ্ন মনীষা। জীবন তখন রঙিন, হালকা। দুজনের ছোট সংসার, সারাদিন টুকিটাকি কাজ সেরে বিকেলে পীযুষের জন্য সুন্দর করে সাজতো মনীষা। কখনো পীযুষ ফোন করতো, অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয়েই মনীষাকে নিয়ে বেড়োতো, ঘুরেটুরে রাতে ডিনার করে ফেরা। বিয়ের পর প্রথম প্রথম ছেড়ে আসা চাকরির জন্য মন কেমন করত মনীষার। কিন্তু পীযুষের একদম নামগন্ধ যে বউ গরমে ঘামে ভিজে অফিস যাবে। বউ থাকবে পুতুলের মত, একমাথা চুলে সুন্দর গন্ধ, পরিপাটি বেশবাস, নিখুঁত মেকআপ করা মুখ, হাতে লম্বা লম্বা নখে নিখুঁত রঙের ছোপ – এই না হলে বউ! কেন পীযুষ কি কম কামায়? না, কোন অভিযোগ ছিল না পীযুষকে নিয়ে মনীষার। পীযুষের মত বর পাওয়া যে ভাগ্যের ব্যাপার সেটা এক বাক্যে মনীষা থেকে শুরু করে মনীষার বাবা-মা ও স্বীকার করত। বান্ধবীরা করত ঈর্ষা, মনীষা করত অহংকার। সেই অহংকার ছিল অটুট তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকী পর্যন্ত। আর সেই বিবাহ বার্ষিকীর পার্টি মনীষার সারাজীবন মনে থাকবে। ‘ ম্যাডাম ও ম্যাডাম’ ওলা ড্রাইভারের এর ডাকে হুঁশ ফেরে মনীষার। আট বছর আগের থেকে নিজেকে টেনে এনে ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়ে ওলা থেকে।
২০০৬ এর ২৬ শে ডিসেম্বর, পালিত বাড়ীতে সাজো সাজো রব। একমাত্র মেয়ে মনীষার বিয়ে। মেয়ে যাকে বলে সর্বগুণসম্পন্না, সুন্দরী বুদ্ধিমতী শিক্ষিতা চাকুরিরতা। পাত্রও লাখে একজন, বিশাল ইঞ্জিনিয়ার, নামকরা প্রাইভেট কোম্পানিতে উঁচু পোস্টে কর্মরত। মনীষা পীযুষের প্রেমে তখন থেকেই মগ্ন। খুব সুন্দর কথা বলত পীযুষ। সবদিক থেকে ছিল মনীষার মনের মত, যাকে বলে ড্রিমম্যান। এরকম যোগাযোগ কজনের ভাগ্যে ঘটে? মনীষা ভাগ্যবতী বলেই না পীযুষের মতো মানুষকে স্বামী হিসেবে পাচ্ছে। চোখের সামনে দিনটা দেখতে পায় মনীষা। আহ্লাদে ছলছল আট বছর আগের সে নিজে, আনন্দে ডগমগ তার বাবা-মা। ২০০৬ এর ২৬শে ডিসেম্বর আর ২০০৯ এর ২৬শে ডিসেম্বর, এর মাঝের সময়টা ছিল রূপকথা। সেদিনই বা কি এমন বেশি বাড়াবাড়ি করেছিল পীযুষ? ভাবে মনীষা। একটু বেশীই মদ খেয়ে ফেলেছিল। চোখ লাল, দাঁড়াতেও পারছিলো না ঠিক করে, জড়িয়ে যাচ্ছিল কথা।,, নিজের পার্টিতে নিজেকেই সামলাতে পারছিল না পীযুষ। আর মনীষা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল নিজেকে সংযত রেখে অতিথি আপ্যায়ন চালিয়ে যাওয়ার। দুজনেরই বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবে ভর্তি ছিল চারদিক। কোন রকমে বাড়িতে ফিরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল সে। লজ্জায় আর অপমানে জর্জরিত হতে হতে ভেবেছিল পরদিন একহাত নেবে পীযুষকে। এমন বকা দেবে, আর হাত বাড়াবে না কোন দিনও মদের বোতলের দিকে। স্বামী-আহ্লাদে আহ্লাদী মনীষা, ভেবেছিল এই শুরু আর এই শেষ। বকা দেবে পীযুষকে, দরকার হলে ঠোঁটও ফোরামে, তাহলেই পীযুষ ধরাশায়ী, আর তাকাবেও না ওদিকে। কিন্তু পরদিন পীযুষকে একথা বলতে গিয়ে হোঁচট খেলো মনীষাই। “কাম অন মনীষা, পার্টিতে এসব হয়েই থাকে, এমন কিছু বড় ব্যাপার না, গ্রো আপ।“ পুরো ব্যাপারটাই হেসে উড়িয়ে দিয়ে উঠে যায় পীযুষ, অফিসের জন্য রেডি হতে। হতভম্ব হয়ে যায় মনীষা। তারপর আস্তে আস্তে নিজেকেই বুঝিয়ে নেয়, “হ্যাঁ পার্টিতে তো লোকে মদ খায়ই, হয়তো বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিল পীযুষ। তেমন আর কি ব্যাপার? আর হবে না”। নিজেকে বুঝিয়ে নেয় এরকম তো হয়ই। কিন্তু এরকম আর কি কি হয়? আর কত কিছু নিয়ে বোঝাবে মনীষা নিজেকে, এরকম তো হয়ই। যেদিন পীযুষ মদ খেয়ে এসে গায়ে হাত তুললো, সেদিন মনীষা কি করে নিজেকে বোঝাবে এরকম তো হয়ই? অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল মনীষা পীযুষের অফিস থেকে ফেরার, ফোনও করেছে, সুইচ অফ। চিন্তা হচ্ছিল, বারবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল উদ্বিগ্নমুখে। শেষে সাড়ে দশটার পর পীযুষের গাড়িটা ঢুকতে দেখে ছুটে গিয়ে দরজায় দাঁড়ায়। পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল পীযুষের হয়তো শরীর খারাপ। কিন্তু টালমাটাল পায়ে পীযুষকে দরজার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে সারা শরীরে যেন কারেন্টের শক লাগে মনীষার। দরজা থেকে সরে দাঁড়াতেও ভুলে যায়। মনীষাকে দরজায় পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ভুরু কুঁচকোয় পীযূষ। “তুমি-তুমি আবার…”, এর থেকে বেশি কথা বেরোয় না মনীষার মুখ থেকে। “আ-হহ্”, প্রচন্ড বিরক্তিতে এক প্রবল ধাক্কায় মনীষাকে সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢোকে পীযুষ। হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে বাঁচে মনীষা। “ তুমি-তুমি আমার গায়ে হাত তুললে? ভেবেছটাকি তুমি? ছোটলোক দের মত বাইরে থেকে গিলে এসে বাড়িতে বউ কে পেটাবে? ভেবো না এসব আমি সহ্য করবো বুঝলে?” সোফায় এলিয়ে থাকা পীযুষের সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচাতে থাকে মনীষা। হঠাৎই ছিটকে উঠে পীযুষ। মনীষা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক চড় মারে তার গালে, তারপর বিড়বিড় করে কিছু বলে আবার ঢুলে পড়ে সোফাতেই। চোখে অন্ধকার দেখে মনীষা, পীযুষ মারল থাকে, পীযুষ মারলো! এক মুহূর্তের জন্য শিবানীর কালশিটে পড়া মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছুটে গিয়ে বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দেয় মনীষা। অনেক রাত অব্দি কাঁদতে কাঁদতে কখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই। সকালে যখন নিজের জামাকাপড় ভর্তি ট্রলি নিয়ে ঘর থেকে বেরোলো তখনো পীযুষ সোফায় ঘুমোচ্ছে।
বাড়িতে বাবা মা বুঝিয়েছিল অনেক। পীযুষ ও ফোন করেছিল। ও নাকি কথা বলতে চায়। ধরেনি মনীষা। পীযুষকে আর সুযোগ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। আজকালকার দিনের শিক্ষিতা প্রগতিশীল মেয়ে মনীষা। পড়ে পড়ে মার খাবার হলে ওর আর শিবানীর মধ্যে পার্থক্য কোথায় রইল। পুলিশ কেস করতে চেয়েছিল, বাবা মার অনেক অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ওটা আর করে উঠতে পারেনি। কিন্তু ফিরেও আর যায়নি। চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে একটা। ডিভোর্সও নিয়ে ছেড়েছেন পীযুষের থেকে। খোরপোষ চায়না ও। নিজের খরচা নিজে চালাতে সক্ষম মনীষা।
বাড়ি ফিরে গা ধুয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মনীষা। চোখের সামনে আবার শিবানীর হাসিমুখটা ভেসে ওঠে। “ অনেক মার খেয়েছি গো বউদি, জানোই তো সব। কতবার বাপের বাড়ি গিয়ে বসেছি, প্রতিজ্ঞা করেছি আর ফিরবো না, আলাদা থাকবো। ছেলেদেরও আমিই মানুষ করব। গতর খেটে খাই আমি, ভয় কিসের! আরো খাটবো, আরো পয়সা পাব। ও খেতে দেয় নাকি আমায়?” হাসি পাচ্ছিল মনীষার। আট বছর পরেও একই ধরনের কথা বলে শিবানী। যদিও তখন আর এখনকার পরিস্থিতিতে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তখনও এই কথাগুলো বলতো শিবানী। বরের সাথে ঝগড়া করে, অপমান-কটুকথা-দুর্ব্যবহার সহ্য করে এসে কাঁদতো মনীষার কাছে। কখনো বা রাগ দেখাত বরের ওপর। বাসন মাজতে মাজতে গজগজ করে যেত এই কথাগুলোই। মায়া হতো মনীষার, আর গর্ব হতো নিজের স্বামী ভাগ্যে। সবাই বলে পুরুষ মানুষ মাত্রেই এক, কিন্তু তার পীযুষ যাকে বলে বিশাল এক্সেপসনাল। মনীষার কত খেয়াল রাখে, কত যত্ন করে। শিবানী যতক্ষণ থাকতো ততক্ষণ এসবই ভাবতো মনীষা, শিবানী চলে যাওয়ার পর ও। আজ শিবানীর ভরা সংসার, খুশিমুখ দেখে মনীষাও খুশি। শিবানীর অত্যাচার সহ্য করা পতিভক্তির নিদর্শন যে ছিলো না সেটা মনীষার থেকে বেশি ভাল আর কে জানে। মনীষা দেখেছে শিবানীকে ছটফট করতে খাঁচায় বন্দি পাখির মত। বারবার মুক্তি চেয়েছে শিবানী কিন্তু সামাজিক আর আর্থিক প্রতিবন্ধকতা তার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে। মনীষার মুক্তি পাওয়া যত সোজা শিবানীর ততটাই কঠিন। তাও আজ শিবানীর সংসার সুখ দেখে তার আর পীযুষের সুখী সংসারের কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে বারবার। মনীষা চলে আসবার পরে বার বার কথা বলতে চেয়েছে পীযুষ, বাবা-মাও অনেক অনুরোধ করেছিল একবার অন্তত পীযুষের কথা শোনার জন্য। আজ আট বছর পর মনীষা স্বাবলম্বী, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা মানুষ। কিন্তু স্বামী-সন্তান-সংসারের থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকা এক একাকী মানুষ। পীযুষের সাথে কথা বললেই হয়তো ফিরে যেত না সে, কিন্তু আজ আট বছর পরেও অজানাই থেকে গেছে তার অত ভালোবাসার পীযুষ সেদিন কিভাবে তার সাথে এত জঘন্য ব্যবহার করতে পেরেছিল। হয়তো সে কোন সমস্যায় ভুগছিল, হয়তো কোন বদ সঙ্গে পড়েছিল, হয়তো মনীষার সঙ্গ তার প্রয়োজন ছিল… কী ছিল সেটা মনীষা কোনদিনও জানতে পারবে না। শিবানির সাথে মনীষাও তার জীবনে জিতেছে, কিন্তু কোথায় যেন লুকিয়ে আছে একটু দীর্ঘশ্বাস।
©Pallabi Saha
Comments
Post a Comment