ভূত ও ভাড়াটে
ভূত ও ভাড়াটে
পল্লবী সাহা
চৌকিতে বসে বসে মনের আনন্দে পা নাচাচ্ছিল রজত। শিস দিতে দিতে ঘরের চারপাশটায় আর একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর ধপ করে শুয়ে পড়লো চৌকিতে। আহ্ শান্তি! আরামে চোখ বুজলো রজত। ঘোষাল বুড়ো মরেছে আজ। বড় শান্তি দিয়ে গেছে। এখন অন্ততঃ এক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। কম জ্বালিয়েছে বুড়ো! রোজ অফিস থেকে ফিরতে না ফিরতেই ডাক পড়তো। মুখ প্যাঁচার মতো করে পাচন গেলার মতো করে বাণী শুনতে হতো রজতকে। কবে ঘর ছাড়বে, নতুন ঘর পেল কিনা, আদৌ খুঁজছে কিনা, এতদিনেও কেন অন্য কোথাও ঘর পেল না ইত্যাদি প্রভৃতি। আরে ঘর পাওয়া কি অতই সোজা? অত কঠিনও নয় বটে। সত্যি বলতে রজত খোঁজেইনি সেভাবে। এইখানে থাকলে তার অনেক সুবিধে। এক তো অফিস কাছে, ভাড়া কম, এতো বড় ঘর, তাছাড়া চব্বিশ ঘন্টা লাইট জল কোন বাধা নেই। এত সুখ ছেড়ে দেয় কেউ বোকার মত? তাই মাথা চুলকে বলতে হত, " আসলে কাকু, ব্যাচেলার মানুষ তো, অনেকে ভাড়া দিতে চায় না। নইলে বলতো, " ভাড়া অনেক বেশি কাকু, সবার তো আর আপনার মত দয়ার শরীর নয়"। চিঁড়ে ভিজতো না অবশ্য এতে। উল্টে আরো কিড়মিড়িয়ে উঠত বুড়ো, "দয়ার শরীর আমার নয়, আমার ছেলের। অন্য কেউ হলে এত দিন সময় দিত না তোমায় বুঝলে? আজ প্রায় ছয় মাস হতে চলল বলছি বাপু ঘরটা ছেড়ে দাও, ছেলের বিয়ে দিয়ে ও ঘরেই রাখবো, ঢুকছে কি কানে? বুড়োর কথা পাত্তাই তো দিচ্ছো না। আমার ছেলে বলেই এই যাত্রা পার পেয়ে যাচ্ছ।" চুপ করে থাকতো রজত। ইঃ ঐ ভ্যাড়াকান্ত পাবলিক আবার ব্যাটাচ্ছেলে! মুচকি হাসে রজত শুয়ে শুয়ে। আর কিছু না, অতি ভদ্দর লোক। তাই খুব বেশি হলে ওই মিনমিনিয়েই অনুরোধ করতে পারে। পড়তো রজতের মতো ছেলের পাল্লায়, ক্যালমা দেখিয়ে দিত এতদিনে। বাপ বাপ করে বাড়ি ছেড়ে পালাতো। যাক আপাতত এক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। মাথাযই থাকবে না তো মাথা ব্যথা।
সন্ধ্যায় খুশি খুশি মনে আলুর চপ কিনে ঘরে ঢুকেই আক্কেলগুড়ুম রজতের, কারেন্ট নেই। কি রকম হলো? রাস্তায় তো লাইট জ্বলছে। দু'তিনবার সুইচ টেপাটেপি করে দেখল তবুও। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ভ্যাপসা গরমে দাঁড়িয়ে কুলকুল করে ঘামছিল রজত। ব্যাপারটা কি? বাপ মরে কি ছেলের সাহস বেড়ে গেল? কারেন্ট না থাকার পেছনে যে সেই এ ব্যাপারে তো কোনো সন্দেহই নেই। দাঁড়া হচ্ছে ব্যাটাচ্ছেলের, দেখাচ্ছি মজা, এই ভেবে রজত পেছনে ঘুরে বেরোতে যাবে, হঠাৎ এক রাম ধাক্কার চোটে হুমরি খেয়ে পড়লো। হাতের আলুর চপ কোথায় ছিটকে পড়লো কে জানে, তবে চৌকির কোণায় মোক্ষম ঠোক্কর লেগে কপালে ফ্রি তে আলু গজিয়ে গেল একখানা। " বাবা গো" বলে চেঁচিয়ে উঠলো রজত। তারপরই ধড়মড়িয়ে উঠে দরজার বাইরে দৌড়ালো। নাহ্, কেউ কোথাও নেই, কে মারল ধাক্কাটা? ব্যাটাচ্ছেলে নিশ্চয়ই কোন শাগরেদ ফিট করে রেখেছিল ধাক্কা দেবার জন্য। কিন্তু রজতকে চেনেনি এখনও। " দাঁড়া হচ্ছে", রাগে প্রায় গোঁ গোঁ করতে করতে রজত দৌড়ালো ওপরে।
শুভ্র দোতলায় নিজের ঘরের লাইব্রেরীতে বসে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলো নিবিষ্টমনে। আচমকা পাঞ্জাব লরীর মতো হুড়মুড়িয়ে রজত এসে ঢুকলো। " এসব কি ব্যাপার শুভ্রবাবু? ঘরের লাইট কেটে দিয়েছেন কেন? আবার লোক লাগিয়ে ধাক্কা মারাচ্ছেন! বলি ব্যাপারটা কি? এবার কী মারধোর করবেন নাকি? কিন্তু জেনে রাখুন, ঘর আমি ছাড়বো না।" রজতের হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার, উদভ্রান্ত চেহারা দেখে থতমত খেয়ে যায় শুভ্র। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে টাইম লাগে। সব শুনে আর বুঝে খুব অবাক হয় শুভ্র, বলে "চলুন তো, এমন তো হওয়ার কথা নয়" বলে রজত কে নিয়ে নিচে নামে শুভ্র, পেছনে পেছনে প্রায় লাফাতে লাফাতে নামছিল রজত। কিন্তু ঘরের কাছে এসেই চোয়াল ঝুলে পড়লো। ঘরে ফটফটিয়ে চলছে লাইট, টেবিলের ওপর ঠোঙায় ধোঁয়াওঠা আলুর চপ, রজতের ব্যাগ চেয়ারের ওপর। কি করবে, কি বলবে বুঝতে পারে না রজত। " না মানে আমি তো দেখলাম", বলতে বলতে কপালে হাত বোলায় রজত। উফ্ নাহ মাথার আলুটা যথাস্থানেই আছে। তাহলে কেসটা কি হল? মাথা ঝুঁকিয়ে চুপচাপ ঘরের ভেতর ঢুকে যায় রজত। শুভ্র পেছন থেকে বলে, " হয়তো লুজ কানেকশান হয়েছে রজতবাবু, সকালে একবার ইলেকট্রিশিয়ান কে আসতে বলব"। অগত্যা লুজ কানেকশন ছাড়া আর কিই বা ভাবা যায়। কিন্তু ধাক্কাটা মারল কে?
বেচারা রজত 'ধাক্কা মারলো কে' ভাবার সময় এটা স্বপ্নেও ভাবেনি যে এ তো সবে প্রশ্নের শুরু। এরপর দুরন্ত এক্সপ্রেসের মত একটার পর একটা প্রশ্ন ঘাড়ে এসে পড়লো বলে। যাকগে আপাতত ধাক্কা মারল কে এটাই রজতের মূল প্রশ্ন। রাতে ঘুমোবার আগে শুয়ে শুয়ে ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে অনেক ভেবে এটাই নিশ্চিত হয়েছে যে ধাক্কাটা শুভ্রই মারিয়েছে কাউকে দিয়ে। পাড়াতে চ্যাংড়া ছেলের অভাব তো নেই, আনন্দের সাথেই রাজি হবে অনেকে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কে জানে। ঘুম ভাঙলো মাঝরাতে, উফ কি গরম। উসখুস করতে করতে দেখে ফ্যান বন্ধ। জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে রাস্তার ল্যাম্পের আলো এসে পড়ছে। তার মানে আবার সেই, আবার কারসাজি। বুড়োর ছেলে যে এত ধড়িবাজ তা কে জানত। চৌকিতে বসে ঘামতে ঘামতে বুড়োর ছেলের বাপান্ত করছিল রজত - হঠাৎ ভূমিকম্প। বেশ জোরেই হল। সেরেছে একি গেরো। পুরোনো দিনের বাড়ি, এখানে ওখানে ফাটল। ভেঙে পড়বে না তো? এর ওপরের ঘরটাই শুভ্রের স্টাডি রুম, যেখানে শুভ্র আরামকেদারায় বসে বই পড়ে। ভূমিকম্পের ঠেলায় আরামকেদারা সমেত শুভ্র এসে তার ঘাড়ে পড়েছে ব্যাপারটা ভাবতে মোটেই ভাল লাগল না রজতের। এর মধ্যেই আবার ভূমিকম্প। না না দাঁড়াও, ভূমিকম্প তো নয়, এ যেন কেউ চৌকি ধরে ঝাঁকাচ্ছে খুব জোরে। কি রাম ঝাঁকুনি রে বাবা! পড়েই যাচ্ছিল রজত। আর ঝাঁকিয়েই চলেছে। এই কে রে? কে চৌকির নীচে? প্রানপনে চৌকির কোনা আঁকড়ে ধরে চেঁচাতে থাকে রজত। বুঝেছি, যখন রজত ওপড়ে গেছিল তখনই শুভ্রর ভাড়া করা কোন পালোয়ান চৌকির তলায় ঘাপটি মেরে বসেছিল। সে ব্যাটাকেই বলে দিয়েছে শুভ্র এরকম ঝাঁকাতে। " তবে রে ব্যাটা, রজত পাইনকে চেন না, দাঁড়া দেখাচ্ছি" , বলে তড়বড়িয়ে নামতে যাচ্ছিল চৌকি থেকে, ঠিক তখনই ঘটে গেল ঘটনাটা। না মানে শুধু ঘটনা নয়, যাকে বলে ভয়াল ভয়ঙ্কর বিভীষিকা। সারা ঘর কাঁপিয়ে বিকট অট্টহাসি হেসে কার গলা যেন গমগমিয়ে উঠলো, " ব্যাটা নয় রে, ব্যাটা নয়, বাপ, বুড়ো বাপ, তোর বুড়ো ভাম", বলার সাথে সাথেই মাথায় এক প্রচণ্ড রদ্দা। তারপর আর কিছু মনে নেই রজতের। ঘুম ভাঙলো অনেক বেলায়। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, ঘোষাল বুড়ো তার কান দুটো আচ্ছা করে মুলে দিচ্ছে আর সে হাত পা ছুঁড়ে চেঁচাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছুঁড়তে গিয়েই ঘুমটা গেল ভেঙে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে যেতেই মাথায় আবার একটা ঠোক্কর। কি হচ্ছেটা কি রে বাবা! মাথাটা তার গুঁড়োই হয়ে যাবে এবারে। ভালো করে চোখ মুছে চারদিক দেখতেই বোধগম্য হলো ব্যাপারটা। সে চৌকির নিচে শুয়ে আছে। একটু ধাতস্ত হয়ে চৌকির ওপর এসে বসতেই হুড়মুড়িয়ে গতরাতের ঘটনা দাড়ি, কমা শুদ্ধ মনে পড়ে গেল আর তখনই রজত উপলব্ধি করল তার গায়ের লোম তো খাড়া হয়ে উঠেইছে, মাথার চুলগুলোও খাড়া হয়ে উঠি উঠি করছে। আর কোনো সন্দেহই নেই। বুড়ো ভাম সে একজনকেই বলত, ঘোষাল বুড়োকে। ব্যাটা ভূত হয়ে এসেছে ভাড়াটে ভাগাবে বলে। কি জ্বালাতন! কি করবে সে এখন? ভূতের সাথে পাল্লা দেবে কি করে? তবে কি এবার অন্য বাড়ি খুঁজতেই হবে? কি মুশকিল রে বাবা!
মাথা চুলকোতে চুলকোতেই অফিসে গেলো রজত। কাকেই বা বলবে এসব? অফিস থেকে বেরিয়ে এগরোল কিনল একটা। আজ আর ভূতের হাতের ছোঁয়া আলুর চপ খাওয়ার সাহস নেই। অন্যমনস্কভাবে এগরোলে একটা কামড় বসিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই দেওয়ালের গায়ে চোখে পড়ল পোস্টারটা, 'মুশকিল আসান, মুশকিল আসান, মুশকিল আসান, সব সমস্যার সমাধান, বশীকরণ ইস্পেশালিস্ট, ভূতবিশেষজ্ঞ শ্রীযুক্ত ভজাবাবার শরণাপন্ন হোন আর সব সমস্যার সমাধান পান'। এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে ফোনে ঠিকানা ফোন নম্বর সমেত একটা ফটো তুলে নিল রজত। খান্নার কাছের একটা ঠিকানা। রজতের অফিস থেকে বেশি দূর নয়। যাবে নাকি একবার? এসব জিনিসের খুব বেশি বিশ্বাস নেই অবশ্য রজতের, কিন্তু সে তো ভূতেও বিশ্বাস ছিলোনা। তারপর কাল রাতে যা হলো! ভাবতেই মাথা টা আরেকবার টনটনিয়ে উঠলো।
খান্নায় পৌঁছে খানিক খুঁজে-টুজে এদিক ওদিক কয়েকটা গলির মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে অবশেষে ভজা বাবার ঘর খুঁজে পেল রজত। ঘুপচি গলির মধ্যে ছোট্ট একটা ঘর। ঘরের সামনে একটা রোগা প্যাঁকাটি ছোকরা বসে বসে বিড়ি ফুঁকছিল। পোস্টারে লেখা মত আগে থেকে দস্তুরমতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই এসেছে রজত। রজতকে দেখে ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো ছোকরা, " আসুন, আসুন রজতবাবু তো?" রজত ঘাড় নাড়তেই বলল, “ বাবা আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছেন, ভেতরে আসুন"। ছোকরার পেছন পেছন ঘরে ঢুকে রজত। ভিতরে আরেকটা ঘর। দরজার পর্দা থাকায় ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না। ভজা বাবা খুব সম্ভব ওই ঘরেই অধিষ্ঠান করছেন। রজতকে বাইরের ঘরে বসিয়ে ছোকরা ঢুকে গেল ভেতরে। খানিক পরেই বেরিয়ে এসে বলল, " আসুন বাবা ডাকছেন"। ছোকরার পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলো রজত। টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে ঘরের মধ্যে। ধুপের গন্ধে ঘর ভরপুর। খানিক দূরে মেঝেতে পিড়ির উপর বসে আছে একটা লোক। এই টিমটিমে আলো আর ধোঁয়ায় দাড়ি গোঁফ ঢাকা মুখের প্রায় কিছুই দেখা গেল না। যাই হোক হাতজোড় করে মাটিতে থেবড়ে বসে পরলো রজত।
মিনিট কুড়ি পর বাসরাস্তায় এসে দাঁড়ালো রজত। কিঞ্চিৎ শান্তির আভাস মুখে। কাল বিকেলে যাবেন ভজা বাবা বুড়োর ভূত তাড়াতে। খুব তো আশ্বাসবাণী দিয়েছেন। কিন্তু আজকের রাতটা নিয়ে খুব একটা সাহস জোটাতে পারছে না রজত। যাইহোক নিমপাতা খাওয়া মুখ নিয়ে অবশেষে বাড়িতে ঢোকে। আসবার আগে পাড়ার মোড়ে শনি ঠাকুরের প্রণামী বাক্সে এগারো টাকা দান করে এসেছে রজত। যাতে এগারো টাকায় খুশি হয়ে শনি ঠাকুর বুড়ো ভামকে, মানে সরি, শ্রদ্ধেয় ঘোষাল বুড়োর অশরীরী আত্মাকে একটু সামলে রাখেন। তাছাড়া ভজাবাবা একটা লাল রংয়ের সুপুরিও দিয়েছে রজতকে। বলেছেন রাতে বালিশের তলায় রেখে শুলে ভূত ধারেকাছে আসবেনা। তবে এটার মেয়াদ এই একরাতই। যাকগে কালতো ভজাবাবা আসছেনই। তবে শনি ঠাকুরের কৃপা তেই হোক বা ভজাবাবার সুপুরির জোরেই হোক, সেদিনের রাতটা মোটামুটি নিশ্চিন্তেই কাটল রজতের। 'মোটামুটি' কেননা মাঝরাতে বাথরুমে যেতে গিয়ে বাথরুমের দরজা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না রজত। শেষে হাতরে হাতরে লাইট জ্বালিয়ে দেখে দরজা দন্ডায়মান দরজার জায়গাতেই।
পরদিন সকাল থেকেই ঘনঘন ঘড়ি দেখছে রজত। ভজা বাবা বলেছেন ঠিক বারোটা বাজতে সাড়ে তিন মিনিট আগে আসবেন। পৌনে বারোটা বেজে যেতেই ভজা বাবা তার চেলা সমেত এসে হাজির। তবে না, ঘরে ঢুকলেন না। প্রথমে তার চেলাটি ঢুকে ঘরের সরেজমিনে তদন্ত করে ভজা বাবার জন্য আসন প্রস্তুত করল। আর এই ফাঁকে রজত ভজা বাবাকে ভালো করে দেখে নিলো। নাহ ভক্তি টক্তি কিছুই জেগে উঠল দেখে। অনেকটা যে লোকটা রজতের অফিসের পাশে চা বিক্রি করে তার মত চেহারাখানা। তবে লাল কাপড়, ধুতি, চাদর যাকে শুদ্ধ বাংলায় বলে রক্তাম্বর পরিহিত, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর চোখদুটো ঢুলুঢুলু। মুখে অভয়দানকারী স্মিত হাসি। যাইহোক ঘড়ি দেখে ঠিক বারোটা বাজার সাড়ে তিন মিনিট আগে ভজাবাবার গৃহপ্রবেশ ঘটলো আর মোটামুটি সোয়া ঘণ্টা পর খাজা বাবার ভূততাড়ণ মহাযজ্ঞ যখন শেষ হল তখন রজতের চোখের সামনে সর্ষে ফুল, গাঁদা ফুল, ডালিয়া ফুল ইত্যাদি যত রকমের হলুদ ফুল আছে সবই ঘূর্ণায়মান। ভজাবাবা তার মন্ত্রপূতঃ ঝাঁটা দিয়ে শুধু সারা ঘরই ঝাড়েননি, রজতকেও আপাদমস্তক ঝেড়ে দিয়ে গেছেন। আর সব শেষে হোমিওপ্যাথি শিশিতে করে আনা একটি অতি উৎকট গন্ধ আর স্বাদওয়ালা কালো রঙের তরল রজতকে বলল এক ঢোঁকে খেয়ে নিতে। রজতের খাবার পর শ্রীমান রঘু, মানে ভজাবাবার চেলা বলল, " বেশ ভক্তিভরে খেয়েছেন তো? নইলে কিন্তু কাজ হবে না"। রজত ঘাড় নেড়ে কোনরকমে বলল, " কী আছে এতে?" " তেমন কিছু না টিকটিকির লেজ, বাদুরের লোম, কাকের ডিমের কুসুম, শকুনের চামড়া, ঘি, মধু আর দই। এখন দেখবেন আপনার ধারে-কাছে ভূত আর ঘেঁষবে না। বলুন শ্রীভজাবাবার জয়।" আর জয়! রজতের মনে হচ্ছে অন্নপ্রাশনের ভাতটাও উঠে এলো বুঝি গলা বেয়ে। " না না না না", মুখ চেপে ধরে রঘু, " ভুলেও বমি করবেন না। উফ্ এসব দুর্বল লোকেদের নিয়ে মহা সমস্যা।" যাই হোক কড়কড়ে একটি গোলাপি নোট পকেট থেকে বের করে দিল রজত। তারপর ভাবল সামনের হাসপাতাল থেকে একবার ঘুরে আসবে কিনা। তারপর যা থাকে কপালে ভেবে শুয়ে রইলো। যা খাইয়েছে ভজাবাবা, আপাতত আগামী দুদিন মুখে আর কিছু দিতে পারবে কিনা সন্দেহ।
শুয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন ঘোর লেগে গেছিল রজতের। হুঁশ এল কাকের ডাকে। খুব কাছ থেকে ডেকে চলেছে কাকটা, আর কি বিচ্ছিরিভাবে! ভালো করে তাকিয়ে দেখল রজত, নাহ সন্ধ্যা হয়ে গেছে, দেখা যাচ্ছে না কিছু ভাল করে। এতক্ষণ শুয়ে ছিল! তাড়াতাড়ি উঠে লাইট জ্বালালো আর জ্বালাতেই দেখতে পেল কাকটাকে। দাঁড়কাক মনে হয়। একটু বেশি বড়সড় আর কুচকুচে কালো। আলমারির ওপরে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে রজতকে। রজত এতটাই অবাক যে কাকটা ঘরে ঢুকলো কি করে এই প্রশ্নটা মাথায় আসতেই পাক্কা দেড় মিনিট লাগলো। আবার ডেকে উঠল কাকটা, কী কর্কশ! " এই যাহ যাহ, হ্যাট" বলে তাড়া দিতেই বোঁ করে নেমে এল কাকটা, চক্কর কাটতে শুরু করল রজতের মাথার ওপর। সেরেছে, একি উৎপাত! কা - ক্কা, কা - ক্কা, ডাকছে না তো যেন হাসছে, মজা দেখছে। বেগতিক দেখে দরজার দিকে দৌড়ালো রজত। বেরোতে হবে এক্ষুনি, বাছাধনকে সুবিধের লাগছে না। কিন্তু, ইইইহহ্, এটা কি?! দরজায় ঝুলছে গোটাকয়েক বাদুড়। ওয়াক-ওয়াক, কি বিচ্ছিরি গন্ধ গায়ে! সর্বনাশা এ আবার কি উৎপাত! শাপলা চক্কর কাটতে কাটতে কাকটা চক্কর কাটতে কাটতে মাঝে মাঝে বেশ নীচে নেমে আসছে। ঠোকরাবে না কি? মুখ দিয়ে আর্তনাদ বেরোল রজতের। টিক টিক টিক টিক - ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক, বলে উঠল উল্টোদিকের দেওয়ালের টিকটিকিটা। টিকটিকিটার দিকে চোখ পড়তে চোখ কপালে উঠল রজতের। এটা কেমন টিকটিকি? গত বছর পুজোর ছুটিতে বন্ধুদের সাথে সুন্দরবন গেছিল রজত। টিকটিকিটাকে দেখে সেখানে দেখা কুমিরগুলোর কথা মনে পড়ল। ঠোঁট চাটছে মাঝে মাঝে জিভ বার করে আর সাপের মতো বাঁকাচ্ছে লম্বা লেজটাকে। গলা শুকিয়ে গেছে রজতের, মাঝে মাঝেই চোখের সামনে সব কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সব বুঝতে পারছে রজত, সব বুঝতে পারছে এবার। টিকটিকির লেজ, বাদুরের লোম, কাকের ডিমের কুসুম আর...আর শকুনের চামড়া। তার ওষুধেই তাকে মারবে ঘোষাল বুড়ো। মাথাটা কেমন করছে। শকুনের দেখা মেলেনি এখনও। বাঁচতেই হবে যেভাবে হোক। হাতের সামনেই চৌকির তলা। আত্মগোপন করার জন্য ওটা ছাড়া আর কিছু দেখতে পারছে না রজত। দম নিয়ে প্রাণপণে দৌড়ে চৌকির তলায় ঢুকতেই চক্ষুস্থির। একটি বিশাল বড় শকুন তার তলায় বসে ড্যাবড্যাব করে রজতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হামাগুড়ি দেওয়ার পোজেই থেকে গেছে রজত, চোখ শকুনে নিবন্ধ। হঠাৎ খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠলো শকুনটা, হেঁড়ে গলায় বলল," কি রজত বাবু, ওষুধ হজম হল?" অবিকল ঘোষাল বুড়োর গলা। সামনে টিকটিকিটা দেওয়াল বেয়ে নেমে এসেছে কাছে। সাথে চলছে তার ঠোঁট চাটা আর লেজ দোলানো। হঠাৎ কাকটা ডেকে উঠল খুব জোরে। তারপরেই পশ্চাৎদেশে ভয়ংকর ঠোক্কর। আঁ আঁ আঁ আঁ - আর কিছু মনে নেই রজতের। চোখের সামনে সব অন্ধকার।
ঘোষালবাবুর নিচের ঘরে তালা ঝুলছে এখন। না ভাড়া আর দেবে না শুভ। বছর কাটলেই বিয়ে, তখন রং করানো হবে ঘরে। আর রজত? তার কথা আপনারাই ভাবুন না হয়।
পল্লবী সাহা
পল্লবী সাহা
চৌকিতে বসে বসে মনের আনন্দে পা নাচাচ্ছিল রজত। শিস দিতে দিতে ঘরের চারপাশটায় আর একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর ধপ করে শুয়ে পড়লো চৌকিতে। আহ্ শান্তি! আরামে চোখ বুজলো রজত। ঘোষাল বুড়ো মরেছে আজ। বড় শান্তি দিয়ে গেছে। এখন অন্ততঃ এক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। কম জ্বালিয়েছে বুড়ো! রোজ অফিস থেকে ফিরতে না ফিরতেই ডাক পড়তো। মুখ প্যাঁচার মতো করে পাচন গেলার মতো করে বাণী শুনতে হতো রজতকে। কবে ঘর ছাড়বে, নতুন ঘর পেল কিনা, আদৌ খুঁজছে কিনা, এতদিনেও কেন অন্য কোথাও ঘর পেল না ইত্যাদি প্রভৃতি। আরে ঘর পাওয়া কি অতই সোজা? অত কঠিনও নয় বটে। সত্যি বলতে রজত খোঁজেইনি সেভাবে। এইখানে থাকলে তার অনেক সুবিধে। এক তো অফিস কাছে, ভাড়া কম, এতো বড় ঘর, তাছাড়া চব্বিশ ঘন্টা লাইট জল কোন বাধা নেই। এত সুখ ছেড়ে দেয় কেউ বোকার মত? তাই মাথা চুলকে বলতে হত, " আসলে কাকু, ব্যাচেলার মানুষ তো, অনেকে ভাড়া দিতে চায় না। নইলে বলতো, " ভাড়া অনেক বেশি কাকু, সবার তো আর আপনার মত দয়ার শরীর নয়"। চিঁড়ে ভিজতো না অবশ্য এতে। উল্টে আরো কিড়মিড়িয়ে উঠত বুড়ো, "দয়ার শরীর আমার নয়, আমার ছেলের। অন্য কেউ হলে এত দিন সময় দিত না তোমায় বুঝলে? আজ প্রায় ছয় মাস হতে চলল বলছি বাপু ঘরটা ছেড়ে দাও, ছেলের বিয়ে দিয়ে ও ঘরেই রাখবো, ঢুকছে কি কানে? বুড়োর কথা পাত্তাই তো দিচ্ছো না। আমার ছেলে বলেই এই যাত্রা পার পেয়ে যাচ্ছ।" চুপ করে থাকতো রজত। ইঃ ঐ ভ্যাড়াকান্ত পাবলিক আবার ব্যাটাচ্ছেলে! মুচকি হাসে রজত শুয়ে শুয়ে। আর কিছু না, অতি ভদ্দর লোক। তাই খুব বেশি হলে ওই মিনমিনিয়েই অনুরোধ করতে পারে। পড়তো রজতের মতো ছেলের পাল্লায়, ক্যালমা দেখিয়ে দিত এতদিনে। বাপ বাপ করে বাড়ি ছেড়ে পালাতো। যাক আপাতত এক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। মাথাযই থাকবে না তো মাথা ব্যথা।
সন্ধ্যায় খুশি খুশি মনে আলুর চপ কিনে ঘরে ঢুকেই আক্কেলগুড়ুম রজতের, কারেন্ট নেই। কি রকম হলো? রাস্তায় তো লাইট জ্বলছে। দু'তিনবার সুইচ টেপাটেপি করে দেখল তবুও। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ভ্যাপসা গরমে দাঁড়িয়ে কুলকুল করে ঘামছিল রজত। ব্যাপারটা কি? বাপ মরে কি ছেলের সাহস বেড়ে গেল? কারেন্ট না থাকার পেছনে যে সেই এ ব্যাপারে তো কোনো সন্দেহই নেই। দাঁড়া হচ্ছে ব্যাটাচ্ছেলের, দেখাচ্ছি মজা, এই ভেবে রজত পেছনে ঘুরে বেরোতে যাবে, হঠাৎ এক রাম ধাক্কার চোটে হুমরি খেয়ে পড়লো। হাতের আলুর চপ কোথায় ছিটকে পড়লো কে জানে, তবে চৌকির কোণায় মোক্ষম ঠোক্কর লেগে কপালে ফ্রি তে আলু গজিয়ে গেল একখানা। " বাবা গো" বলে চেঁচিয়ে উঠলো রজত। তারপরই ধড়মড়িয়ে উঠে দরজার বাইরে দৌড়ালো। নাহ্, কেউ কোথাও নেই, কে মারল ধাক্কাটা? ব্যাটাচ্ছেলে নিশ্চয়ই কোন শাগরেদ ফিট করে রেখেছিল ধাক্কা দেবার জন্য। কিন্তু রজতকে চেনেনি এখনও। " দাঁড়া হচ্ছে", রাগে প্রায় গোঁ গোঁ করতে করতে রজত দৌড়ালো ওপরে।
শুভ্র দোতলায় নিজের ঘরের লাইব্রেরীতে বসে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলো নিবিষ্টমনে। আচমকা পাঞ্জাব লরীর মতো হুড়মুড়িয়ে রজত এসে ঢুকলো। " এসব কি ব্যাপার শুভ্রবাবু? ঘরের লাইট কেটে দিয়েছেন কেন? আবার লোক লাগিয়ে ধাক্কা মারাচ্ছেন! বলি ব্যাপারটা কি? এবার কী মারধোর করবেন নাকি? কিন্তু জেনে রাখুন, ঘর আমি ছাড়বো না।" রজতের হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার, উদভ্রান্ত চেহারা দেখে থতমত খেয়ে যায় শুভ্র। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে টাইম লাগে। সব শুনে আর বুঝে খুব অবাক হয় শুভ্র, বলে "চলুন তো, এমন তো হওয়ার কথা নয়" বলে রজত কে নিয়ে নিচে নামে শুভ্র, পেছনে পেছনে প্রায় লাফাতে লাফাতে নামছিল রজত। কিন্তু ঘরের কাছে এসেই চোয়াল ঝুলে পড়লো। ঘরে ফটফটিয়ে চলছে লাইট, টেবিলের ওপর ঠোঙায় ধোঁয়াওঠা আলুর চপ, রজতের ব্যাগ চেয়ারের ওপর। কি করবে, কি বলবে বুঝতে পারে না রজত। " না মানে আমি তো দেখলাম", বলতে বলতে কপালে হাত বোলায় রজত। উফ্ নাহ মাথার আলুটা যথাস্থানেই আছে। তাহলে কেসটা কি হল? মাথা ঝুঁকিয়ে চুপচাপ ঘরের ভেতর ঢুকে যায় রজত। শুভ্র পেছন থেকে বলে, " হয়তো লুজ কানেকশান হয়েছে রজতবাবু, সকালে একবার ইলেকট্রিশিয়ান কে আসতে বলব"। অগত্যা লুজ কানেকশন ছাড়া আর কিই বা ভাবা যায়। কিন্তু ধাক্কাটা মারল কে?
বেচারা রজত 'ধাক্কা মারলো কে' ভাবার সময় এটা স্বপ্নেও ভাবেনি যে এ তো সবে প্রশ্নের শুরু। এরপর দুরন্ত এক্সপ্রেসের মত একটার পর একটা প্রশ্ন ঘাড়ে এসে পড়লো বলে। যাকগে আপাতত ধাক্কা মারল কে এটাই রজতের মূল প্রশ্ন। রাতে ঘুমোবার আগে শুয়ে শুয়ে ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে অনেক ভেবে এটাই নিশ্চিত হয়েছে যে ধাক্কাটা শুভ্রই মারিয়েছে কাউকে দিয়ে। পাড়াতে চ্যাংড়া ছেলের অভাব তো নেই, আনন্দের সাথেই রাজি হবে অনেকে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কে জানে। ঘুম ভাঙলো মাঝরাতে, উফ কি গরম। উসখুস করতে করতে দেখে ফ্যান বন্ধ। জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে রাস্তার ল্যাম্পের আলো এসে পড়ছে। তার মানে আবার সেই, আবার কারসাজি। বুড়োর ছেলে যে এত ধড়িবাজ তা কে জানত। চৌকিতে বসে ঘামতে ঘামতে বুড়োর ছেলের বাপান্ত করছিল রজত - হঠাৎ ভূমিকম্প। বেশ জোরেই হল। সেরেছে একি গেরো। পুরোনো দিনের বাড়ি, এখানে ওখানে ফাটল। ভেঙে পড়বে না তো? এর ওপরের ঘরটাই শুভ্রের স্টাডি রুম, যেখানে শুভ্র আরামকেদারায় বসে বই পড়ে। ভূমিকম্পের ঠেলায় আরামকেদারা সমেত শুভ্র এসে তার ঘাড়ে পড়েছে ব্যাপারটা ভাবতে মোটেই ভাল লাগল না রজতের। এর মধ্যেই আবার ভূমিকম্প। না না দাঁড়াও, ভূমিকম্প তো নয়, এ যেন কেউ চৌকি ধরে ঝাঁকাচ্ছে খুব জোরে। কি রাম ঝাঁকুনি রে বাবা! পড়েই যাচ্ছিল রজত। আর ঝাঁকিয়েই চলেছে। এই কে রে? কে চৌকির নীচে? প্রানপনে চৌকির কোনা আঁকড়ে ধরে চেঁচাতে থাকে রজত। বুঝেছি, যখন রজত ওপড়ে গেছিল তখনই শুভ্রর ভাড়া করা কোন পালোয়ান চৌকির তলায় ঘাপটি মেরে বসেছিল। সে ব্যাটাকেই বলে দিয়েছে শুভ্র এরকম ঝাঁকাতে। " তবে রে ব্যাটা, রজত পাইনকে চেন না, দাঁড়া দেখাচ্ছি" , বলে তড়বড়িয়ে নামতে যাচ্ছিল চৌকি থেকে, ঠিক তখনই ঘটে গেল ঘটনাটা। না মানে শুধু ঘটনা নয়, যাকে বলে ভয়াল ভয়ঙ্কর বিভীষিকা। সারা ঘর কাঁপিয়ে বিকট অট্টহাসি হেসে কার গলা যেন গমগমিয়ে উঠলো, " ব্যাটা নয় রে, ব্যাটা নয়, বাপ, বুড়ো বাপ, তোর বুড়ো ভাম", বলার সাথে সাথেই মাথায় এক প্রচণ্ড রদ্দা। তারপর আর কিছু মনে নেই রজতের। ঘুম ভাঙলো অনেক বেলায়। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, ঘোষাল বুড়ো তার কান দুটো আচ্ছা করে মুলে দিচ্ছে আর সে হাত পা ছুঁড়ে চেঁচাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছুঁড়তে গিয়েই ঘুমটা গেল ভেঙে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে যেতেই মাথায় আবার একটা ঠোক্কর। কি হচ্ছেটা কি রে বাবা! মাথাটা তার গুঁড়োই হয়ে যাবে এবারে। ভালো করে চোখ মুছে চারদিক দেখতেই বোধগম্য হলো ব্যাপারটা। সে চৌকির নিচে শুয়ে আছে। একটু ধাতস্ত হয়ে চৌকির ওপর এসে বসতেই হুড়মুড়িয়ে গতরাতের ঘটনা দাড়ি, কমা শুদ্ধ মনে পড়ে গেল আর তখনই রজত উপলব্ধি করল তার গায়ের লোম তো খাড়া হয়ে উঠেইছে, মাথার চুলগুলোও খাড়া হয়ে উঠি উঠি করছে। আর কোনো সন্দেহই নেই। বুড়ো ভাম সে একজনকেই বলত, ঘোষাল বুড়োকে। ব্যাটা ভূত হয়ে এসেছে ভাড়াটে ভাগাবে বলে। কি জ্বালাতন! কি করবে সে এখন? ভূতের সাথে পাল্লা দেবে কি করে? তবে কি এবার অন্য বাড়ি খুঁজতেই হবে? কি মুশকিল রে বাবা!
মাথা চুলকোতে চুলকোতেই অফিসে গেলো রজত। কাকেই বা বলবে এসব? অফিস থেকে বেরিয়ে এগরোল কিনল একটা। আজ আর ভূতের হাতের ছোঁয়া আলুর চপ খাওয়ার সাহস নেই। অন্যমনস্কভাবে এগরোলে একটা কামড় বসিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই দেওয়ালের গায়ে চোখে পড়ল পোস্টারটা, 'মুশকিল আসান, মুশকিল আসান, মুশকিল আসান, সব সমস্যার সমাধান, বশীকরণ ইস্পেশালিস্ট, ভূতবিশেষজ্ঞ শ্রীযুক্ত ভজাবাবার শরণাপন্ন হোন আর সব সমস্যার সমাধান পান'। এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে ফোনে ঠিকানা ফোন নম্বর সমেত একটা ফটো তুলে নিল রজত। খান্নার কাছের একটা ঠিকানা। রজতের অফিস থেকে বেশি দূর নয়। যাবে নাকি একবার? এসব জিনিসের খুব বেশি বিশ্বাস নেই অবশ্য রজতের, কিন্তু সে তো ভূতেও বিশ্বাস ছিলোনা। তারপর কাল রাতে যা হলো! ভাবতেই মাথা টা আরেকবার টনটনিয়ে উঠলো।
খান্নায় পৌঁছে খানিক খুঁজে-টুজে এদিক ওদিক কয়েকটা গলির মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে অবশেষে ভজা বাবার ঘর খুঁজে পেল রজত। ঘুপচি গলির মধ্যে ছোট্ট একটা ঘর। ঘরের সামনে একটা রোগা প্যাঁকাটি ছোকরা বসে বসে বিড়ি ফুঁকছিল। পোস্টারে লেখা মত আগে থেকে দস্তুরমতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই এসেছে রজত। রজতকে দেখে ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো ছোকরা, " আসুন, আসুন রজতবাবু তো?" রজত ঘাড় নাড়তেই বলল, “ বাবা আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছেন, ভেতরে আসুন"। ছোকরার পেছন পেছন ঘরে ঢুকে রজত। ভিতরে আরেকটা ঘর। দরজার পর্দা থাকায় ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না। ভজা বাবা খুব সম্ভব ওই ঘরেই অধিষ্ঠান করছেন। রজতকে বাইরের ঘরে বসিয়ে ছোকরা ঢুকে গেল ভেতরে। খানিক পরেই বেরিয়ে এসে বলল, " আসুন বাবা ডাকছেন"। ছোকরার পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলো রজত। টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে ঘরের মধ্যে। ধুপের গন্ধে ঘর ভরপুর। খানিক দূরে মেঝেতে পিড়ির উপর বসে আছে একটা লোক। এই টিমটিমে আলো আর ধোঁয়ায় দাড়ি গোঁফ ঢাকা মুখের প্রায় কিছুই দেখা গেল না। যাই হোক হাতজোড় করে মাটিতে থেবড়ে বসে পরলো রজত।
মিনিট কুড়ি পর বাসরাস্তায় এসে দাঁড়ালো রজত। কিঞ্চিৎ শান্তির আভাস মুখে। কাল বিকেলে যাবেন ভজা বাবা বুড়োর ভূত তাড়াতে। খুব তো আশ্বাসবাণী দিয়েছেন। কিন্তু আজকের রাতটা নিয়ে খুব একটা সাহস জোটাতে পারছে না রজত। যাইহোক নিমপাতা খাওয়া মুখ নিয়ে অবশেষে বাড়িতে ঢোকে। আসবার আগে পাড়ার মোড়ে শনি ঠাকুরের প্রণামী বাক্সে এগারো টাকা দান করে এসেছে রজত। যাতে এগারো টাকায় খুশি হয়ে শনি ঠাকুর বুড়ো ভামকে, মানে সরি, শ্রদ্ধেয় ঘোষাল বুড়োর অশরীরী আত্মাকে একটু সামলে রাখেন। তাছাড়া ভজাবাবা একটা লাল রংয়ের সুপুরিও দিয়েছে রজতকে। বলেছেন রাতে বালিশের তলায় রেখে শুলে ভূত ধারেকাছে আসবেনা। তবে এটার মেয়াদ এই একরাতই। যাকগে কালতো ভজাবাবা আসছেনই। তবে শনি ঠাকুরের কৃপা তেই হোক বা ভজাবাবার সুপুরির জোরেই হোক, সেদিনের রাতটা মোটামুটি নিশ্চিন্তেই কাটল রজতের। 'মোটামুটি' কেননা মাঝরাতে বাথরুমে যেতে গিয়ে বাথরুমের দরজা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না রজত। শেষে হাতরে হাতরে লাইট জ্বালিয়ে দেখে দরজা দন্ডায়মান দরজার জায়গাতেই।
পরদিন সকাল থেকেই ঘনঘন ঘড়ি দেখছে রজত। ভজা বাবা বলেছেন ঠিক বারোটা বাজতে সাড়ে তিন মিনিট আগে আসবেন। পৌনে বারোটা বেজে যেতেই ভজা বাবা তার চেলা সমেত এসে হাজির। তবে না, ঘরে ঢুকলেন না। প্রথমে তার চেলাটি ঢুকে ঘরের সরেজমিনে তদন্ত করে ভজা বাবার জন্য আসন প্রস্তুত করল। আর এই ফাঁকে রজত ভজা বাবাকে ভালো করে দেখে নিলো। নাহ ভক্তি টক্তি কিছুই জেগে উঠল দেখে। অনেকটা যে লোকটা রজতের অফিসের পাশে চা বিক্রি করে তার মত চেহারাখানা। তবে লাল কাপড়, ধুতি, চাদর যাকে শুদ্ধ বাংলায় বলে রক্তাম্বর পরিহিত, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর চোখদুটো ঢুলুঢুলু। মুখে অভয়দানকারী স্মিত হাসি। যাইহোক ঘড়ি দেখে ঠিক বারোটা বাজার সাড়ে তিন মিনিট আগে ভজাবাবার গৃহপ্রবেশ ঘটলো আর মোটামুটি সোয়া ঘণ্টা পর খাজা বাবার ভূততাড়ণ মহাযজ্ঞ যখন শেষ হল তখন রজতের চোখের সামনে সর্ষে ফুল, গাঁদা ফুল, ডালিয়া ফুল ইত্যাদি যত রকমের হলুদ ফুল আছে সবই ঘূর্ণায়মান। ভজাবাবা তার মন্ত্রপূতঃ ঝাঁটা দিয়ে শুধু সারা ঘরই ঝাড়েননি, রজতকেও আপাদমস্তক ঝেড়ে দিয়ে গেছেন। আর সব শেষে হোমিওপ্যাথি শিশিতে করে আনা একটি অতি উৎকট গন্ধ আর স্বাদওয়ালা কালো রঙের তরল রজতকে বলল এক ঢোঁকে খেয়ে নিতে। রজতের খাবার পর শ্রীমান রঘু, মানে ভজাবাবার চেলা বলল, " বেশ ভক্তিভরে খেয়েছেন তো? নইলে কিন্তু কাজ হবে না"। রজত ঘাড় নেড়ে কোনরকমে বলল, " কী আছে এতে?" " তেমন কিছু না টিকটিকির লেজ, বাদুরের লোম, কাকের ডিমের কুসুম, শকুনের চামড়া, ঘি, মধু আর দই। এখন দেখবেন আপনার ধারে-কাছে ভূত আর ঘেঁষবে না। বলুন শ্রীভজাবাবার জয়।" আর জয়! রজতের মনে হচ্ছে অন্নপ্রাশনের ভাতটাও উঠে এলো বুঝি গলা বেয়ে। " না না না না", মুখ চেপে ধরে রঘু, " ভুলেও বমি করবেন না। উফ্ এসব দুর্বল লোকেদের নিয়ে মহা সমস্যা।" যাই হোক কড়কড়ে একটি গোলাপি নোট পকেট থেকে বের করে দিল রজত। তারপর ভাবল সামনের হাসপাতাল থেকে একবার ঘুরে আসবে কিনা। তারপর যা থাকে কপালে ভেবে শুয়ে রইলো। যা খাইয়েছে ভজাবাবা, আপাতত আগামী দুদিন মুখে আর কিছু দিতে পারবে কিনা সন্দেহ।
শুয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন ঘোর লেগে গেছিল রজতের। হুঁশ এল কাকের ডাকে। খুব কাছ থেকে ডেকে চলেছে কাকটা, আর কি বিচ্ছিরিভাবে! ভালো করে তাকিয়ে দেখল রজত, নাহ সন্ধ্যা হয়ে গেছে, দেখা যাচ্ছে না কিছু ভাল করে। এতক্ষণ শুয়ে ছিল! তাড়াতাড়ি উঠে লাইট জ্বালালো আর জ্বালাতেই দেখতে পেল কাকটাকে। দাঁড়কাক মনে হয়। একটু বেশি বড়সড় আর কুচকুচে কালো। আলমারির ওপরে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে রজতকে। রজত এতটাই অবাক যে কাকটা ঘরে ঢুকলো কি করে এই প্রশ্নটা মাথায় আসতেই পাক্কা দেড় মিনিট লাগলো। আবার ডেকে উঠল কাকটা, কী কর্কশ! " এই যাহ যাহ, হ্যাট" বলে তাড়া দিতেই বোঁ করে নেমে এল কাকটা, চক্কর কাটতে শুরু করল রজতের মাথার ওপর। সেরেছে, একি উৎপাত! কা - ক্কা, কা - ক্কা, ডাকছে না তো যেন হাসছে, মজা দেখছে। বেগতিক দেখে দরজার দিকে দৌড়ালো রজত। বেরোতে হবে এক্ষুনি, বাছাধনকে সুবিধের লাগছে না। কিন্তু, ইইইহহ্, এটা কি?! দরজায় ঝুলছে গোটাকয়েক বাদুড়। ওয়াক-ওয়াক, কি বিচ্ছিরি গন্ধ গায়ে! সর্বনাশা এ আবার কি উৎপাত! শাপলা চক্কর কাটতে কাটতে কাকটা চক্কর কাটতে কাটতে মাঝে মাঝে বেশ নীচে নেমে আসছে। ঠোকরাবে না কি? মুখ দিয়ে আর্তনাদ বেরোল রজতের। টিক টিক টিক টিক - ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক, বলে উঠল উল্টোদিকের দেওয়ালের টিকটিকিটা। টিকটিকিটার দিকে চোখ পড়তে চোখ কপালে উঠল রজতের। এটা কেমন টিকটিকি? গত বছর পুজোর ছুটিতে বন্ধুদের সাথে সুন্দরবন গেছিল রজত। টিকটিকিটাকে দেখে সেখানে দেখা কুমিরগুলোর কথা মনে পড়ল। ঠোঁট চাটছে মাঝে মাঝে জিভ বার করে আর সাপের মতো বাঁকাচ্ছে লম্বা লেজটাকে। গলা শুকিয়ে গেছে রজতের, মাঝে মাঝেই চোখের সামনে সব কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সব বুঝতে পারছে রজত, সব বুঝতে পারছে এবার। টিকটিকির লেজ, বাদুরের লোম, কাকের ডিমের কুসুম আর...আর শকুনের চামড়া। তার ওষুধেই তাকে মারবে ঘোষাল বুড়ো। মাথাটা কেমন করছে। শকুনের দেখা মেলেনি এখনও। বাঁচতেই হবে যেভাবে হোক। হাতের সামনেই চৌকির তলা। আত্মগোপন করার জন্য ওটা ছাড়া আর কিছু দেখতে পারছে না রজত। দম নিয়ে প্রাণপণে দৌড়ে চৌকির তলায় ঢুকতেই চক্ষুস্থির। একটি বিশাল বড় শকুন তার তলায় বসে ড্যাবড্যাব করে রজতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হামাগুড়ি দেওয়ার পোজেই থেকে গেছে রজত, চোখ শকুনে নিবন্ধ। হঠাৎ খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠলো শকুনটা, হেঁড়ে গলায় বলল," কি রজত বাবু, ওষুধ হজম হল?" অবিকল ঘোষাল বুড়োর গলা। সামনে টিকটিকিটা দেওয়াল বেয়ে নেমে এসেছে কাছে। সাথে চলছে তার ঠোঁট চাটা আর লেজ দোলানো। হঠাৎ কাকটা ডেকে উঠল খুব জোরে। তারপরেই পশ্চাৎদেশে ভয়ংকর ঠোক্কর। আঁ আঁ আঁ আঁ - আর কিছু মনে নেই রজতের। চোখের সামনে সব অন্ধকার।
ঘোষালবাবুর নিচের ঘরে তালা ঝুলছে এখন। না ভাড়া আর দেবে না শুভ। বছর কাটলেই বিয়ে, তখন রং করানো হবে ঘরে। আর রজত? তার কথা আপনারাই ভাবুন না হয়।
পল্লবী সাহা
Comments
Post a Comment